নাটোর

0
  • Thursday, January 6, 2011
  • রেজওয়ান
  • Labels: Natore
  • কাঁচা গোল্লার দেশ নাটোরে রয়েছে পুরনো আমলের অনেক অনেক পাকা ভবন। রয়েছে দীর্ঘ এক ইতিহাস। যার সঙ্গে স্মৃতি হয়ে রয়েছে রাজা-রাণীদের নাম। যা আমাদের অতীত অহঙ্কার-গর্ব আর ঐতিহ্যের স্মারক। লিখেছেন-মোস্তাফিজুর চৌধুরী মোস্তাক
    কাঁচাগোল্লার নাম শুনলেই ভোজন প্রিয় মানুষের নাটোরের কথা মনে পড়ে যাবে। কিংবা জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেন মনে করিয়ে দেয় উত্তরবঙ্গের এ জেলাটির কথা। বিশাল চলন বিল, রাজ-রাজন্য আর মহারানী ভবানীর পূণ্যভূমি অর্ধবঙ্গেশ্বরী উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা নাটোর। পর্যটকদের কাছে নাটোর একটি দর্শনীয় স্থান।
    নাটোরের দিঘাপাতিয়ার রাজবাড়ি বর্তমানে উত্তরা গণভবন। ১৫০ বিঘা জমির ওপর সপ্তদশ শতকে দয়ারাম রায় এটি নির্মাণ করেন। নাটোরে দুটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ রাজবাড়ি রয়েছে। একটি দিঘাপাতিয়া ও অন্যটি রানী ভবানীর রাজবাড়ি। নাটোরের মহারাজা দিঘাপাতিয়া রাজপ্রাসাদে বাস করতেন। এটি ৪০০ বছরের পুরনো। রাজার মৃত্যুর পর রানী ভবানী জমিদারির ভার গ্রহণ করেন। রানী ভবানী ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ধর্মপরায়ণ। কতগুলো জনকল্যাণমূলক শর্তের পরিপ্রেক্ষিতেই রাজকুমার রামকান্তের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তিনি সুদীর্ঘ ৫০ বছর দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন। বাড়িটি বর্তমানে 'উত্তরা গণভবন' নামে পরিচিত। সুন্দর স্থাপত্যের নির্দশনটি মনোরম পরিবেশে সুরক্ষিত এলাকায় অবস্থিত। এখানে থাকার জন্য রেস্ট হাউজ আছে।
    ৪০০ বছরের পুরনো এ রাজবাড়িতে ঢুকেই প্রথমেই চোখে পড়বে তোরণ মাঝে মধ্যে কামান। ভেতরে রয়েছে শানবাঁধানো ঘাটসহ সুবিশাল দীঘি। দীঘির চারপাশে সুসজ্জিত ফুলের বাগান। চারদিকে পরিখা, সুউচ্চ প্রাচীর, বিশাল লৌহ ফটক। অপূর্ব নির্মাণশৈলী, প্রবেশদ্বারের সিংহ দরজায় স্থাপিত ঘড়ি। সিংহ দরজার পরেই রয়েছে পরিখা এর ওপর নির্মিত সুদৃশ্য সেতু। সেতু পার হলে বিশাল মাঠ। মাঠ পেরোলেই অপূর্ব কীর্তির বিশার বিশাল বাগিচা, আছে কৃত্রিম হীরা গাছ, শ্বেতপাথরের মূর্তি। প্রাসাদ পক্ষের প্রবেশদ্বারে রয়েছে সারা গায়ে পিতলের বর্ম পরিহিত অতন্দ্র প্রহরীর মূর্তি। দেয়ালে ঝাড়বাতি আর মেঝেতে পৈল্পিক অল্পনা। ফুলে ফুলে ভরা এক নয়নাভিরাম সুরম্য প্রাসাদ যা দেখে আপনি বিমোহিত হবেন। ঘুরে দেখে নিন দরবার গৃহ, জলসাঘর, অন্দরমহল, একবৃহৎ আকৃতির ঘড়ি, শ্বেত পাথরের নারীমূর্তি। উপাসনালয়, রাজাদের ছবি, অস্ত্র, পোশাক-আশাক ইত্যাদি।
    রানী ভবানীর পৈতৃক বাড়ি নওগাঁ শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে ছাতিয়ান গ্রামে। এরাও ছিলেন এ অঞ্চলের জমিদার। রানীর বিয়ের পূর্বশর্ত হিসেবে খননকৃত ৩৬৫টি পুকুর এখনও আছে। এখানে আরও দেখতে পারবেন জয়দুর্গা-মন্দির, দোলমঞ্চ আরও অনেক স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ। নাটোর রাজবাড়িই রানী ভবানী প্যালেস নামে পরিচিত। নাটোর শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৬৬ একর জমির ওপর রাজবাড়িটি অবস্থিত। অসংখ্য বৃক্ষরাজি শোভিত পাখির কলকাকলিতে মুখর ছায়াশীতল রাজবাড়িটি মনোমুগ্ধকর। নাটোরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান এ রাজবাড়ির চারদিকে পরিখা, একটি মাত্র প্রবেশ পথ। শত্রুর আক্রমণ মোকাবেলায় এ কৌশল নেয়া হয়। রাজবাড়িটি বর্তমানে পর্যটন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখানে ইচ্ছে করলে বনভোজনও করা যেতে পারে। আনন্দ কালীবাড়ি, তারকেশ্বর মন্দির, গঙ্গামন্দির এবং রাজবিগ্রহে আজও জাঁকজমক পূজা হয়। এছাড়াও দয়ারাজপুর রাজবাড়ি, চৌগ্রামের রাজবাড়ি, জোড়াশির মন্দির, চৌধুরী জমিদার বাড়ি প্রভৃতি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রানী ভবানী প্রতিষ্ঠিত জয়কালী মন্দির ও মন্দিরের পাশে ৪৭ বিঘা আয়তনের বিরাট জয়কালী দীঘি রয়েছে। রানী ভবানীর রাজবাড়ি থেকে এ দীঘির তলদেশ দিয়ে জয়কালী মন্দিরে যাওয়ার সুড়ঙ্গ পথ আছে। বর্তমানে তা চলাচলের জন্য অযোগ্য অব্যবহৃত হলেও প্রবেশমুখ দর্শন করা যায়। চলনবিলের কথা মনে আসতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাখি আর মাছের সমাহার। বিশালাকৃতির এই বিলে বছরের বেশিরভাগ সময়ই পানি থাকে। পর্যটকদের জন্য এটি একটি চমৎকার স্থান। এ বিলের মধ্যে তিশিখালীতে একটি মাজার আছে। ইংরেজ আমলে এ চলনবিলের অধিবাসী ফকির মজনু শাহর নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয়েছিল। দ্বীপসদৃশ একাধিক স্পট আছে বিশাল চলনবিলের অভ্যন্তরে। পর্যটকদের জন্য এখানে তেমন সুযোগ-সুবিধা গড়ে না উঠলেও নৌকায় আপনি অনায়াসেই ভ্রমণ করতে পারেন। শীতকালে অনেক অতিথি পাখি আসে এখানে।
    যেভাবে যাবেন : রাজধানীর শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড়, গাবতলী প্রভৃতি স্থান থেকে নাটোরের উদ্দেশে দিবা-রাত্রি এসি-ননএসি গাড়ি ছেড়ে যায়। এসব গাড়িতে চার ঘণ্টার মধ্যেই আপনি পেঁৗছে যাবেন নাটোরে। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নাটোরে আসতে পারেন সরাসরি একতা ট্রেনে করে।
    কোথায় যাবেন : সার্কিট হাউজ, চলনবিল রেস্ট হাউজ। পল্লীবিদ্যুৎ রেস্ট হাউজ। চিনিকল রেস্ট হাউজে থাকতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে রেস্ট হাউজ ব্যবহারের অনুমতি নিতে হবে। এছাড়াও বেসরকারি আবাসনের ব্যবস্থাও রয়েছে। আপনার সাধ্য ও পছন্দের মধ্যেই আবাসন সুবিধা বেছে নিতে পারেন।